Tuesday, 5 March 2013

আলোর ছায়া


এই নিয়ে তিনবার হলকিন্তু সবুজের জন্য কাজটা করতে পারল না মিনহাজআবার নিচে তাকাল মিনহাজমানুষগুলোকে কতো ছোট্ট দেখাচ্ছে২০ তালা বিল্ডিং এর ছাদ থেকে এরকমই মনে হবার কথামিনহাজের মনে হল সেও ক্ষুদ্র একজনএই জগতে তার কোন প্রয়োজন নেইপরক্ষনেই মনে পরল ছোট্ট ভাইটির কথা,অসুস্থ মায়ের কথামিনহাজ বুঝতে পারছে না,সে কি করবেচোখ বুঝলেই দুঃসহ সৃতিগুলো তারা করে ফিরছে তাকেলাবণ্যর সাথে তার প্রথম পরিচয় মেডিকেল কোচিং আর দশটা ছেলের যেভাবে প্রেম হয় তার ক্ষেত্রে সেটা হয়নিলাবণ্যকে প্রথম দেখেই মনে হয়েছিল আল্লাহ যেন ওকে মিনহাজের জন্যই তৈরি করছেনলাবণ্যের মা প্রায়ই ফোন করতেন মিনহাজের আন্টিকেএকদিন ফোন রিসিভ করতে গিয়ে আচমকা পরিচয় হয়ে গেল লাবণ্যের সাথেপরের দিন মিনহাজ আবার ফোন দিলকেউ কোন কথা বলছিল নামিনহাজ কি বলবে বুঝতে পারছিল নাএভাবে মিনিট ৪২ সেকেন্ড পার হয়ে গেলঅবশেষে নিরবতা ভেঙ্গে মিনহাজ প্রথম কথা বললো,'আমি কি কারো সাথে কথা বলছি?'ওই দিন ওই পর্যন্তই ওই রাতে মিনহাজের চোখের দু পাতা এক হল নালাবণ্যের মুখটা সে কিছুতেই ভুলতেই পারছিল না বইয়ের পাতা থেকে শুরু করে নামাজের সিজদা সব জায়গা ... সব জায়গাই লাবণ্যের ছবি
একদিন মিনহাজ বই পরছিল ঠিক তখনি একটা ফোন এলআশপাশে কেউ না থাকায় সেই ফোন রিসিভ করলো ওপাশে লাবণ্যের কণ্ঠ সুনে হিতাহিত শুন্য হয়ে গেলমেয়েলি কণ্ঠটি বলল,'আমি কি কারো সাথে কথা বলছি?'মিনহাজের মনটা অদ্ভুত শান্তিতে ভরে গেল সেদিনের মিনিটের সংলাপ তাকে অন্য একটা পৃথিবীতে নিয়ে গেল ,যেখানে শুধু লাবণ্য নামের মেয়েরাই থাকেমাঝে মাঝে লাবণ্য তাকে ফোন করে শুধু একটা কথাই বলে,'আমি কি কারো সাথে কথা বলছি?'তারপর ফোনটা রেখে দেয়একদিন আলাপ চারিতার মাঝে রান্নার কথা আসলোমিনহাজ লাবণ্যকে জিজ্ঞেস করল সে কি রাধতে পারেলাবণ্য বলল সে শুধু নুডুলস রান্না করতে পারেমিনহাজ হঠাত বলে বলল,'আমি সারা জীবন তোমার হাতের নুডুলস খেতে চাই,তুমি কি খাওয়াবে আমাকে?'...লাবণ্যের দুচোখ বেয়ে শুধু অশ্রু ঝরছিল......যে কান্না পরম আরাধ্য ভালবাসাকে নিজের মত করে বুঝে পাওয়ার কান্নাএরপর মিনহাজ লাবণ্যের জুটি পিছে ফিরে তাকায়নি
বিমূর্ত প্রেমের জোয়ারে টিএসসি,আশুলিয়া,নন্দন,বেড়িবাধ,বোটানিক্যাল গার্ডেন সব ভেসে গেলসেই জোয়ার মিনহাজের মেডিকেল প্রস্তুতিকে ভাসিয়ে নিতে দিধা করেনিফলে যা হবার কথা তাই হল- টি ভর্তি পরিক্ষা দিয়ে কোথাও সুযোগ হল না স্বপ্নের রঙ্গিন দুনিয়া থেকে পাথুরে বাস্তবে নেমে এলো সেতার এই কষ্ট দরিদ্র বাবার ক্লিষ্ট মুখ,অসুখি মায়ের কান্না দেখে আরও বেড়ে গেলকিন্তু এই কেউ এলো না সান্তনার হাত বারিএহিনমন্ন হয়ে পরল সেদুঃখ ভরা ভারাক্রান্ত হৃদয় নিয়ে ঢাকা ফিরল সেঢাকা এসেই অ্যান্টির তেঁতো বকার তিক্ত সাধ পেলকথায় আসে অভাগা যেদিকে তাকায় সে দিকে সমুদ্র শুকিয়ে যায়সপ্তাখানেক পর মেডিকেল পরিক্ষাকিন্তু কে তাকে প্রেরনা জোগাবে?সেকি তার শেষ আশাতার জন্য কন প্রেরনা পাবে নাএতসব ঘটনা তাকে চরম অভিমানি করে তুললমিনহাজ ঠিক করল এই জীবন আর রাখবেনা হতভাগা এই মুখকে সে লাবণ্যের সামনে হাজির করতে চাইলনা লাবণ্য অবশ্য তাকে সে সুযোগ দিল নাসেদিন বিকালে লাবণ্য আসেই আন্টিদের বাসার ছাদে নিয়ে গেললাবণ্য সবই শুনল কিন্তু মুখে কিছুই বলল না তাই মিনহাজ মনে মনে অবাকই হলআচমকা লাবণ্য তার ধরে বলল,'মিনহাজ তুমি আমার চোখের দিকে তাকাও' এই প্রথম লাবণ্যের হাত ধরল মিনহাজচোখ রেখে বলল,'মিনহাজ আমি জানি তুমি পারবেতোমাকে আমার জন্য পারতে হবেবাকি দিন গুলো মন দিয়ে পড়',লাবণ্যের ছলছল চোখের দিকে মিনহাজের মনে হল সে পারবেলাবণ্যের জন্য হলেও তাকে পারতে হবেতার বুক থেকে হাজার মনের পাথরটা এক নিমিষেই নেমে গেলঅশ্রু সিক্ত চোখে লাবণ্য বল্ল,'তুমি যদি চান্স পাও,তোমার জীবনের সবচেয়ে বর উপহারটা আমিই দেব
৯ই জানুয়ারী মেডিকেলের রেজাল্ট বের হলমিনহাজ অবিশ্বাস ভাবে একটি নামকরা মেডিকালে চান্স পেয়ে গেলমিনহাজ নিজে অবশ্য এত অবাক হল নাতার বিশ্বাস ছিল সে পারবেরাস্তার পাশের দোকান থেকে সবার আগে লাবণ্যকে ফোন করলফোন পাওয়ার পর লাবণ্য কিছুক্ষন নিরব থেকে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কান্না শুরু করলবিকেলে ধানমন্ডি লেকের পারে দেখা হলে মিনহাজ সবার আগে তার জীবনের সবচেয়ে দামি গিফট চাইলোলাবণ্য গম্ভীর মুখেই বল্ল,'তোমার যদি আপত্তি না থাকে আগামি শুক্র বারে আমরা বিয়ে করছিআমরা সপরিবারে বছরের জন্য ফ্রান্স চলে যাচ্ছিআমাদের বিয়ের কথা কেউ জানবে নাতুমি প্রতিষ্ঠিত হবার আগেই আমাকে পাবেমিনহাজ সবই মেনে নিলতাদের মধ্যে আরও অনেক স্বপ্নের কথা হল লাবণ্য হাসতে হাসতে বলল,'আমাদের প্রথম সন্তান হবে মেয়ে,যার নাম হবে মিলা,মিনহাজের মি আর লাবণ্যের লা'
ফুরফুরে মন নিয়েই বাসায় ফিরল মিনহাজকিন্তু তারপরও মনের ভিতর কি জন্য একটা খচখচ করছিলসে ভাবছিল দু বছর পর ফিরে লাবণ্য তাকে মনে রাখবেতো?কিন্তু পরক্ষনেই মনের সব সন্দেহ জুজু কাটিয়ে ঠিক করলো,বিয়ে সে করবেই এবং সেটা শুক্রবারেইকিন্তু অসুস্থ মায়ের মুখ,দরিদ্র বাবার অভাবি চেহারা তাকে অন্যমনস্ক করে দিচ্ছিলবিকালে মিনহাজ রেডি হচ্ছিল কাজী অফিসে যাবার জন্নবিধাতা বোধহয় তার এই রেডি হওয়া দেখে নিরবে মুচকি হেসেছিলেন
ঠিক ওই দিন বিকালে মিনহাজের মা মারাত্মক শ্বাসকষ্টে আক্রান্ত হওয়ায় জরুরি ভিত্তিতে আইসিউ তে ভর্তি করা হলদিশেহারা মিনহাজ কি করবে বুঝতে পারছিল নাশেষে ঠিক করল লাবণ্যের বাসায় ফোন করে তার মায়ের অসুস্থতার কথা জানিয়ে দেবেকিন্তু তার আগেই বাসা থেকে বেড়িয়ে যাওয়ায় ফোনে লাবণ্যকে পেল নাঅসহায় বোধ করল সেকিভাবে অসুস্থ মাকে আইসিইউতে রেখে ৪২ কিমি দুরের কাজী অফিসে যায়?নিজেকে কিছুটা সামলে নিয়ে ঠিক করল রাতেই লাবণ্যকে জানিয়ে দেবে আগামীকাল সকালেই তারা বিয়ে করছেকিন্তু বিধাতা বোধহয় আবারো মুচকি হাস্লেনরাতে লাবণ্যের প্রচণ্ড জ্বর থাকায় ওর সাথে মিনহাজ কোনভাবেই যোগাযোগ করতে পারল নাচূড়ান্ত দুর্ঘটনা হল শনিবার সকালেরবিবার হরতাল থাকায় শনিবার সকালের ফ্লাইটেই লাবণ্যরা সপরিবারে ফ্রান্সে চলে গেলদুনিয়াটা যেন অন্ধকার হয়ে আসছিল মিনহাজেরকি করবে বুঝতে পারছিল না সেলাবণ্য যে তার প্রতি একটা বাজে ধারনা করেছে এই বেপারে তার কোন সন্দেহ রইল নাতারপরও তার আশা ছিল রাগ ভেঙ্গে লাবণ্য হয়ত তার সাথে যোগাযোগ করবেকিন্তু মিনহাজের আশা পুরন হল নাদুবছর পর খবর পেল লাবণ্য চট্টগ্রাম মেডিকেলে চান্স পেয়েছেমিনহাজ একবার ভাবল গিয়ে সরাসরি দেখা করবেকিন্তু সাহসে কুলালো নাতীব্র অপরাধ তাকে একেবারে আছন্ন করে ফেললফোন,মোবাইল,ইমেইল কোনটাই লাবণ্যের অভিমান ভাঙ্গাতে পারল নামিনহাজ হারিয়ে ফেলল জীবনের প্রতি সকল আগ্রহ
৩৫ বছর পরের কথাপ্রখ্যাত মেডিকেল স্পেশালিষ্ট ডা মিনহাজের ওপেন হার্ট সার্জারি হবেফ্রান্স থেকে কার্ডিয়াক সার্জন আসছেনওটি টেবিলে শুয়ে ডা মিনহাজ ভাবছিলেন তার দীর্ঘ ৫৫ বছরের জীবনে পাওয়া না পাওয়ার কথাএই জীবনে তিনি যা চেয়েছেন তা সবই পেয়েছেন্,শুধু একটা জিনিস পাননিমিনহাজ ভাবছে অপারেশন সাকসেস না হলে এই অপুরনতা নিয়েই হয়তো মারা যেতে হবেএই কথা যখন ভাবছিল তখন বিখ্যাত মহিলা কার্ডিয়াক সার্জন ওটিতে এসে পৌঁছেছেনউনি এসেই মিনহাজের হাত ধরে কুশল জিজ্ঞেস করে বলল,'আমি ডা লাবণ্য হায়দার,আপনি ভাল আছেন?'সহকারি ডাক্তাররা তখন মিনহাজকে অ্যানসথেসিয়া দিচ্ছিল৩৫ বছর পর হলেও মিনহাজ লাবণ্যকে চিনতে একটুও ভুল করলো নাআবেগতাড়িত মিনহাজ কোন জবাবই দিতে পারল না,শুধু একপলকে তাকিয়ে রইল এদিকে অ্যানসথেসিয়ার প্রভাব শুরু গেছেপুরোপুরি চেতনা হারানোর আগে মিনহাজ শুধু বিড়বিড় করছিল,'আমি কি কারো সাথে কথা বলছি',...এই কথা শুনে কানে যেতেই ডাঃ লাবণ্য চমকে ঘাড় ঘুরিয়ে মিনহাজের দিকেতিন যুগ হারিয়ে যাওয়া ভালবাসাকে চিনতে একমুহূর্তও দেরি হল না লাবণ্যেরদুফোটা অশ্রু চোখের বাধ ভাঙছিল তখন সহকারি সার্জন বলল 'আসুন ম্যাডাম অপারেশন শুরু করিওদিকে মিনহাজের মনে হলো লাবণ্যের মুখটা আস্তে আস্তে অনেক দূরে সরে যাচ্ছে, রঙ্গিন মুখটা আস্তে আস্তে সাদা তারপর ধুসর তারপর একসময় মিলিয়ে গেলপুরোপুরি চেতনা হারানোর আগে মিনহাজের মনে হল,এখন সে মারা গেলেও তার কোন আক্ষেপ থাকবেনা্,কেননা ভালবাসার মানুষের হাতে মৃত্যুতেও তার আপত্তি নেই
লিখেছেন-Mahmud Hasan

No comments:

Post a Comment