Thursday, 14 March 2013

দিনলিপি


"জানো,আমার যখন খুব রাগ অথবা মন খারাপ হয় তখন আমি কি করি? চোখ বন্ধ করে খুব অনুভব করার চেষ্টা করি প্রথম যেদিন তুমি আমাকে ছুঁয়েছিলে সেদিনকার কথা। মনে আছে তোমার? তুমি সামনে গটগট করে হাঁটছিলে। আমি পিছু পিছু লজ্জা লজ্জা ভঙ্গিতে হাঁটছিলাম। চুপিচুপি বলি আজকে...আমার না লজ্জা লাগছিল না তেমন। মনে হয়েছিল লজ্জাটা বোধহয় দেখানো প্রয়োজন ... তাই ই লজ্জালজ্জা ভাব নিচ্ছিলাম আরকি... অনেকক্ষণ তাকিয়েছিলাম তোমার হাতের দিকে... মনে মনে সাহস অর্জন করছিলাম হাতটা ধরার। যেই সাহসটুকু হল,যেই ভাবলাম এখনই সময় হাতটা ধরার তখনই তুমি হঠাৎ দাঁড়িয়ে গেলে... ঘুরে গটগট করে আমার দিকে এগিয়ে এলে... ডানহাত টা দিয়ে আমার বামগালটা একটু ছুঁলে... খুব আস্তে... মনে হচ্ছিল যেন একটু লাগলেই ভেঙ্গে যাব এমনভাবে ধরছ... শীতের হাওয়া এসে চুলগুলো এলোমেলো করে দিয়েছিল...হাত দিয়ে সামনের চুলগুলো কানের পিছনে গুঁজে দিয়ে আবারো গটগটিয়ে হাঁটা শুরু করলে... যখন যেটা ইচ্ছা তখন সেটা করা থেকে কেউ তোমাকে আটকাতে পারেনা কখনো, তাইনা? জানো? সেদিন বাসায় যাবার পথে আমি সারাক্ষণ গালে হাত দিয়ে বসেছিলাম... বাসায় যাওয়ার পর মা-র কাছে খুব ঝাড়ি খেলাম গালে হাত দিয়ে বসে থাকার জন্য... গালে হাত দিলে নাকি জামাই মারা যায়... কেমন অদ্ভুত না?! আজকাল খুব সেকথা মনে হয়!! তুমি কেমন আছ বলতো?"

পড়ছিলাম অবনীর ডায়েরি...অবনীর সাথে আমার প্রথম দেখা হয় ক্লাস সিক্স কিংবা সেভেনে থাকতে... তারপর আবার ক্লাস টেনে... তারপর আবারো ভার্সিটিতে ভর্তির পর...তারপর প্রতিদিনই দেখা হতে থাকে...একদিন when harry met sally দেখার সময় অবনী আমাকে ফিসফিস করে বলেছিল,"আরে!! এটাতো পুরা আমাদের গল্প।" গল্পটা আসলে ওরকমই ছিল... প্রথমে প্রচন্ড অপছন্দ করতাম...তারপর বন্ধুত্ব...তারপর ধুপধাপ প্রেম...

রাতের বেলা টেবিল ল্যাম্পের আলোতে চুপিচুপি পরছিলাম অবনীর ডায়েরি... পাশের ঘর থেকে বউয়ের নাক ডাকার ক্ষীণ শব্দ ভেসে আসছে...ওকে বিয়ের এই চার বছরে কম করে হলেও বোধহয় চারশবার বলেছি নাকডাকার কথা। ও বিশ্বাসই করেনা! একদিন রেকর্ড করে নিয়ে শুনাতে হবে। অবনীর ডায়েরি আমার হাতে আসে গত সপ্তাহে। লুকিয়ে লুকিয়ে পড়তে হয়! বউ টের পেলে আস্ত রাখবেনা কিছুতেই! কেমন যেন খাপছাড়া লেখা। তারিখ এলোমেলো...মনে হয় অনেকদিন পর পর একেকটা লেখা লেখা হয়েছে... আর সবচেয়ে অবাক করা বিষয় হল প্রতিটা লেখা আমাকে উদ্দেশ্য করে... অবনী কি জানতো আমি একদিন ওর এই লেখাগুলো পড়ব?!!

"
আজকে খুব ইচ্ছা করছিল বৃষ্টিতে ভিজতে...তোমাকে কতবার কতভাবে হিন্ট দিলাম ভিজব বলে তুমি কানেই নিলেনা!! আমিতো একটা মেয়ে, নাকি? আর কিভাবে বলতাম বল? তোমার নাকি বৃষ্টি ভাললাগে না! বৃষ্টিতে নাকি খালি তোমার পথের কাদার কথাই মনে পড়ে! তুমি এত আনরোমান্টিক কেন বলতো! রিকশায় ফেরার পথে গায়ের সাথে লেগেছিলাম। হঠাতই রিকশা থামিয়ে একগোছা কদম ফুল কিনে দিলে! যাও তোমার সব দোষ মাফ!

বাদল-দিনের প্রথম কদমফুল করেছ দান,
আমি দিতেএসেছি শ্রাবণেরগান॥

বাসায় এসে ফুলগুলো হাতে নিয়ে ছাদে উঠে দৌড়েদৌড়ে বৃষ্টিতে ভিজেছি। তোমার ভিজতে হবেনা। আমিই তোমার হয়ে বৃষ্টিতে ভিজে নেব সবসময়! এখন জ্বরে জবুথবু হয়ে কম্বলের নিচে বসে লিখছি। বালিশের পাশে কদমফুল গুলো আছে। সারাঘরে কদম ফুলের মাদক মাদক ঘ্রাণ। মনে হচ্ছে তুমি বাতাস হয়ে আমাকে ঘিরে আছো... জড়িয়ে আছো আষ্টেপৃষ্ঠে... তোমাকে ছুঁয়ে দিতে ইচ্ছে করছে... হাতের বাইরে আর কতকাল এভাবে থাকবে বলতো?!"

পাগল, আবেগী এই অবনীকে আমি কখনই চিনতামনা...আমার পরিচয় ছিল হিসেবি,যৌক্তিক আর একটু লাজুক অবনীর সাথে... কোথায় কোন ভার্সিটিতে ভর্তি হব তার খোঁজ এনে দিত মেয়েটা... ধারের টাকার পরিমাণ বেড়ে গেল ব্যাগের চিপা থেকে টাকা বের করে দিত আমাকে ...খুব নরম স্বরে কথা বলত সবসময়... লজ্জালজ্জা ভঙ্গিতে... ঝগড়া হত কিন্তু আমি সবসময়ই বলে যেতাম...ও শুনত...কে জানতো ওর মাঝে এতো কথা লুকিয়ে আছে!

"
একদিন আমি তোমাকে ঠিক ফিসফিস করে আবৃত্তি করে শুনাবো-

"
সে এসে অন্ধকারে চতুর চোরের মতো
আমার পকেট থেকে নেবে সব স্থলপদ্মগুলি
বলবে কানের কাছে চুপি চুপি অসম্ভব বদমাশ সে,
-
চল ঘুরে আসি রাতের শো থেকে
তারপর নিয়ে যাবে ক্রমাগত ভুল ঠিকানায়
তবু সেই ভীষণ বদমাশটা আমার সমস্ত ভুল ভাগ করে নেবে,
ওর সমস্ত পাপ লিখে যাবে আমার ডায়েরিতে
আমার পাপ হাতে নিয়ে ধর্মযাজকের মতো অহঙ্কারে ঢুকবে গির্জায়"

কি রকম নাটক নাটক ইচ্ছা না? জানো আমি ড্রামা করতে ভীষণ পছন্দ করি? তোমার সাথে আমার যা কথা হয় তার বেশির ভাগ আমি বাসা থেকে রিহার্সাল দিয়ে আসি জানো? কোন কথাটা বললে তার বিপরীতে তুমি কোন কথা বলতে পারো এরকম একশ সিচুয়েশন চিন্তা করি আমি... কিরকম মজা না? আরো মজা কি জানো? আমার রিহার্সাল দেয়ার বেশির ভাগ কথাই তোমাকে বলা হয়না... যা ভাবি তার কিছুই তুমি বলনা!! এরকম কেন তুমি? যেদিন প্রথম তোমাকে আমার পাপের কথা বলেছিলাম সেদিন ভেবেছিলাম তুমি পেছন ফিরে আর তাকাবে না কখনো। অথচ আমার ভুলগুলো,পাপগুলো কখনো তোমাকে আমার কাছে আসা থেকে আটকায়নি! কোন পূণ্যে তোমাকে পেয়েছি বলতো?"

বউ পানি খেতে উঠেছে...ভাব করলাম ফাইলে খুব মনোযোগে কাজ করছি...মাথার চুলগুলো এলোমেলো করে দিল খুব! অবনীর কথা মনে পড়ে যায়... তখনো আমরা বন্ধু... সম্পর্কটা পুর্ণতা পায়নি তখনো... টিএসসির ঘাস ছিঁড়ছিলাম বসে বসে... হঠাত মেয়েটা বলে ওঠে ওর আগের সম্পর্কের কথা... আমি শুধু ওকে দেখছিলাম... চোখের মাঝে পানি টলটল করছিল... নীচের ঠোঁট কেঁপেকেঁপে উঠছিল বারবার... ইচ্ছা করছিল ওকে বুকের মধ্যে চেপে ধরে রাখি... আর প্রচন্ড রাগ হচ্ছিল ঐ জানোয়ারটার প্রতি... সেসব কবেকার কবেকার কথা... মন খারাপ হবেনা হবেনা করেও একটু খারাপ হয়ে গেল... পাশের ঘর থেকে অর্ধাঙ্গিনী ডেকে ওঠে... আমি তাড়াতাড়ি ডায়েরি শেষ করায় মন দেই...

"
আজ পহেলা ফাল্গুন...আজকে তোমার জন্য একগাদা ফাল্গুনের গান...
যদি তারে না ই চিনি গো সে কি আমায় নেবে চিনে
এই নব ফাল্গুনের দিনে-- জানিনে জানিনে॥
সে কি আমার কুঁড়ির কানে কবে কথা গানে গানে,
পরান তাহার নেবে কি নে এইনব ফাল্গুনের দিনে--
জানিনে, জানিনে॥
সেকি আপন রঙে ফুল রাঙাবে।
সেকি মর্মে এসে ঘুম ভাঙাবে।
ঘোমটা আমার নতুন পাতার হঠাৎ দোলা পাবে কি তার।,
গোপন কথা নেবে কি নে এই নব ফাল্গুনের দিনে--
জানিনে, জানিনে॥

আজ দেখা হলনা... বাসায় বসে বসে খুব সাজলাম... হলুদ শাড়ি... কপালে ছোট্ট হলুদ টিপ... হাতে একগাদা কাঁচের রিনিঝিনি চুড়ি... হলুদ, কমলা, লাল, সবুজ... মা অবাক হয়ে তাকিয়েছিল...মনে মনে বলেছি

"
ফুল ফুটুক আর নাই ফুটুক আজ বসন্ত"...দেখা হোক আর নাই হোক আজ বসন্ত...
তোমার প্রজাপতির পাখা
আমার আকাশ-চাওয়া মুগ্ধ চোখের রঙিন-স্বপন-মাখা।
তোমার চাঁদের আলোয়
মিলায় আমার দুঃখসুখের সকল অবসান॥

ফাগুন,হাওয়ায় হাওয়ায় করেছি যে দান--
তোমার হাওয়ায় হাওয়ায় করেছি যে দান--
আমার আপন হারা প্রাণ আমার বাঁধন-ছেড়া প্রাণ॥"

এইসব হাবিজাবি কথা লেখা পুরো ডায়েরি জুড়ে...কিছু কবিতা...কিছু গান... শেষের দিকের লেখাগুলো খুব ছোট... একলাইন, দুলাইন...নিজেরকথা...অন্য কারো কথা...

"
কি জানি কিসের লাগি প্রাণ করে হায় হায়..."

"
মন চায় হৃদয় জড়াতে কারো চির ঋণে..."

"
কাঠবেড়ালির চারা লাফায় উঠানে জানো তার মানে?"

"
আজরাতে ফকফকা একটা জ্যোৎস্না ছিল... সিদ্ধার্থের গৃহত্যাগী জ্যোৎস্না... বারান্দায় একলা দাঁড়িয়েছিলাম অনেক অনেকক্ষণ... তুমি এলেও পারতে..."

"
মাঝে মাঝে চিঠি লিখতে ইচ্ছে হয়
প্রযুক্তির যুগে চিঠির মত বোঝা আর কে বহন করে বল?
তবুও বোকা মন চিঠির শোকে পাথর হয়।
গল্পের ছাঁদে চিঠি লেখি
শতমানুষ পড়ে
তুমি পড়না..."

ব্যস্ত অবনী বোধহয় লেখার সময় পায়নি... আমি পাতা উলটে যাই... ডায়েরির ভেতর থেকে ঝরে পরে শুকিয়ে যাওয়া কদমফুল... এক টুকরা টিস্যু পেপার... একটা চুইংগামের খোসা... একপাতায় সেঁটে আছে হলুদ একটা টিপ... এইসব ছোটখাটো অবান্তর স্মৃতি... আমি কিছুই ধরে রাখিনি... অবনী রেখেছে... অবনী অনেক অনেক দূরে চলে গিয়েছে... আমি নিজেই কি অবনীকে অনেক অনেক দূরে ঠেলে দিয়েছি...!

একদম শেষপাতায় আবার তুলনামূলক বেশ বড়সড় একটা লেখা পেলাম-

"
এই যে বাবুসাহেব! আপনি যে গত একসপ্তাহ ধরে মাঝরাতে বসে বসে আমার ডায়েরি পড়েন এটা কি ঠিক? আমার ভেতরকার সমস্ত খবর যে তুমি জেনে যাচ্ছ তা কি ঠিক হচ্ছে বল? তোমার মনের কোন কথাইতো আমাকে জানতে দাওনা! মাঝে মাঝে ভালোবাসি বলতে কি হয় বলতো?! মাঝে মাঝে দমকা বাতাসের মত নাড়া দিয়ে গেলে কি হয়? আমার সব কিছু জেনে গেলেই হবে? আমার বুঝি কিছু জানতে ইচ্ছা করেনা?

যাই হোক যেহেতু এতো কিছুই জেনে গেলে আরো একটা ব্যাপার জানো তাহলে? ছোটবেলা থেকেই আমার পুতুল খেলতে খুব ভালো লাগে... যেখান থেকে ডায়েরিটা পেয়েছ ওখানে দেখ একটা ছোট্টবালিশ আর দুটা কোলবালিশ আছে... আমাদের বাসায় একটা জীবন্ত পুতুল আসছে তার জন্য... ছোটবেলায় একা একা খেলেছি...এখন তোমাকে নিয়ে খেলব...,মজা হবেনা?

অনেকরাত হয়েছে...ঘুমুতে আসো এখন...

-
ইতি
বউ"


চোখের কোণের পানির ফোঁটা সাবধানে মুছে নিলাম... বিছানায় এলোমেলো হয়ে অবনী ঘুমুচ্ছে... ওকে দুহাতের ভেতর টেনে এনে ফিসফিসিয়ে বলি-ভালোবাসি...ঘুমের মধ্যেই অবনী উত্তর দেয়...আর আমি ভাবি কোন পূণ্যে আমি অবনীকে পেলাম...